বিয়ের আগে যাচাই-বাছাইয়ের আহ্বান: ধর্মান্তরিত মুসলিমদের ক্ষেত্রেও দ্বীন ও চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ
নেশন টুডে২৪ নিউজ ডেস্ক
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য কোনো ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন—এমন ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে দ্বীন, চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক background যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামি চিন্তাবিদরা। একই সঙ্গে শুধু পূর্বের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নতুন মুসলিমকে খারাপ মনে করাও ইসলামের শিক্ষা নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে একজন মানুষের দ্বীন ও চরিত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কাছে এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ করো, তাহলে তার সঙ্গে বিয়ে দাও।” —জামে তিরমিজি, ১০৮৪; সুনান ইবন মাজাহ, ১৯৬৭।
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু বাহ্যিক পরিচয়, অর্থ-সম্পদ, সুন্দর কথাবার্তা কিংবা আবেগের ভিত্তিতে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বরং দ্বীন ও চরিত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
কেউ নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করলে বিয়ের আগে তার ইসলামের মৌলিক আকিদা ও বিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা, নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের প্রতি মনোভাব, হালাল-হারাম সম্পর্কে সচেতনতা এবং ইসলাম গ্রহণের পর তার জীবনযাপনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে—এসব বিষয়ে বাস্তব তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।
তবে কোনো ব্যক্তির অন্তরের ঈমানের চূড়ান্ত বিচার মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তার প্রকাশ্য আচরণ, জীবনযাপন এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বিয়ের ক্ষেত্রে চরিত্র যাচাইও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।” —সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুমিনদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।” —জামে তিরমিজি, ১১৬২।
এ কারণে সম্ভাব্য পাত্রের মিথ্যাচার, প্রতারণা, মাদকাসক্তি, সহিংসতা, নারীদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ, দায়িত্বহীনতা, ঋণসংক্রান্ত গুরুতর সমস্যা কিংবা পূর্বের বিয়ে ও প্রতারণার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্পর্কে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।
বিয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বাস্তব সমস্যা জানা থাকলে তা গোপন করাও অনুচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।” —সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭০।
ইসলাম কারও পূর্বের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে চিরদিনের জন্য অপমানিত করে না। কেউ আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলে সে মুসলিম সমাজের একজন সদস্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।” —সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩।
তাই “সে আগে হিন্দু ছিল”—এটি কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার একমাত্র কারণ হতে পারে না। একইভাবে “সে ইসলাম গ্রহণ করেছে”—এই পরিচয়টিও যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
অভিভাবকদের জন্য বিয়ের আগে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পাত্রের পরিবার সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া, কর্মস্থল ও আয়ের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া, পূর্বের জীবন ও সামাজিক আচরণ সম্পর্কে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া, দ্বীনদারি ও নামাজের বাস্তব অবস্থা জানা এবং মাদক, প্রতারণা, সহিংসতা বা গুরুতর চারিত্রিক সমস্যার ইতিহাস আছে কি না তা যাচাই করা।
নতুন মুসলিম হলে তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি সম্পর্কে স্থানীয় আলেম বা বিশ্বস্ত ইসলামি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া যেতে পারে। তবে যাচাইয়ের নামে কোনো ব্যক্তিকে অপমান, হয়রানি বা সামাজিকভাবে হেয় করা উচিত নয়।
এ ক্ষেত্রে মেয়ের মতামত ও সম্মতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জোর করে বিয়ে দেওয়া ইসলামি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথাবার্তা, আবেগ বা প্রেমের সম্পর্কের ওপর একমাত্র ভিত্তি করে বিয়ের সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাস্তব তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সতর্কতা মানে কারও ইসলাম গ্রহণকে সন্দেহ করা নয়; বরং বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভবিষ্যৎ জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা বিবেচনা করা। একজন ব্যক্তি পূর্বে অন্য ধর্মের অনুসারী হলেও বর্তমানে যদি আন্তরিকভাবে ইসলাম পালন করেন, উত্তম চরিত্রের অধিকারী হন এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপন করেন, তাহলে তার অতীত পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাকে অপমান করা উচিত নয়।
অন্যদিকে শুধু ইসলাম গ্রহণের দাবি শুনে যাচাই-বাছাই ছাড়া বিয়ে দেওয়াও যথাযথ নয়। বিয়ের আগে দ্বীন, চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও বাস্তব জীবনযাপন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেন।” —সূরা আত-তালাক, ৬৫:২।
মন্তব্য করুন