ভারতীয় প্রভাবমুক্ত ও সমমর্যাদার সম্পর্ক: বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ ও করণী
লেখক ডাঃ মোঃ আব্দুর রহমান চৌধুরী
বাংলাদেশ ও ভারত ভৌগোলিকভাবে পাশাপাশি অবস্থিত এবং দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক যোগাযোগ রয়েছে। তাই ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বন্ধুত্ব মানে নির্ভরশীলতা নয়, আর সহযোগিতা মানে সার্বভৌমত্বে আপস নয়।
বর্তমান বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে রাজনৈতিক আস্থার সংকট, সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা এবং পানি বণ্টনের মতো বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। ২০২৬ সালেও দুই দেশ এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনার চেষ্টা করছে।
১. ভৌগোলিক বাস্তবতা ও ভারতের আকার
বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারতের সীমান্ত। ভারতের ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়।
এই অসম ভৌগোলিক ও শক্তির ভারসাম্য ভারতের হাতে স্বাভাবিকভাবেই বেশি কৌশলগত প্রভাব তৈরি করে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—এই বাস্তবতার মধ্যেও কীভাবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রাখা যায়।
২. অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নির্ভরতা
বাংলাদেশের শিল্প ও ভোক্তা বাজারের একটি অংশ ভারতীয় কাঁচামাল, পণ্য ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। আবার ভারতও বাংলাদেশের বাজার, যোগাযোগব্যবস্থা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পায়।
অর্থাৎ সম্পর্কটি একতরফা নয়; বরং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। কিন্তু এই নির্ভরশীলতা যেন কোনো পক্ষের জন্য অতিরিক্ত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক leverage-এ পরিণত না হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতেও বাণিজ্য ভারসাম্য, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থায় অসমতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
৩. পানি বণ্টন—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি
বাংলাদেশ ও ভারত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগ করে। কিন্তু সব নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নেই। বিশেষ করে তিস্তা পানি বণ্টন দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত।
এদিকে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা এবং বাংলাদেশ নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।
তাই বাংলাদেশের স্বার্থে পানি কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী, তথ্যভিত্তিক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করা দরকার।
৪. সীমান্ত সমস্যা ও মানুষের নিরাপত্তা
বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ পারাপারসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সমস্যা রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাও দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল বিষয়।
দুই দেশই সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট:
সীমান্তে অপরাধ দমন হবে, কিন্তু নিরীহ মানুষের জীবন ও মানবাধিকারের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
৫. রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ও আস্থার সংকট
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব রয়েছে—এমন অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। একইভাবে ভারতও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিস্থিতিকে তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের দৃষ্টিতে দেখে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়েছে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি বর্তমান সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে রাখতে হবে:
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণই নেবে।
কোনো বিদেশি রাষ্ট্র নয়।
তাহলে বাংলাদেশ কীভাবে ভারতীয় প্রভাবের ভারসাম্য তৈরি করতে পারে?
১শক্তিশালী অর্থনীতি
নিজস্ব শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
২ বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ
শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, ASEAN ও অন্যান্য বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে।
৩ পানি কূটনীতি শক্তিশালী করা
তিস্তা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য ব্যবস্থাপনার জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য ও আন্তর্জাতিক নদী আইনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৪ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দৃঢ়তা
সীমান্তে শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার—তিনটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সমমর্যাদার কূটনীতি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হওয়া উচিত:
“বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে কোনো আপস নয়।”
বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেও চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
মনে রাখতে হবে
ভারতবিরোধিতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।
একইভাবে ভারতনির্ভরশীলতাও বাংলাদেশের স্বার্থে নয়।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত—
ভারতের শত্রু নয়, ভারতের অধীনও নয়।
বন্ধুত্ব থাকবে—কিন্তু সমমর্যাদার ভিত্তিতে।
সহযোগিতা থাকবে—কিন্তু পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।
সম্পর্ক থাকবে—কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে।
১৯৭২ সালের বাংলাদেশ–ভারত শান্তি ও মৈত্রী চুক্তিতেও দুই দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির কথা উল্লেখ রয়েছে।
উপসংহার
বাংলাদেশকে কোনো দেশের “প্রভাববলয়” থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো দেশের প্রভাববলয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজস্ব শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে বাস্তববাদী, বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক। যেখানে ভারতের স্বার্থ আছে, সেখানে বাংলাদেশেরও ন্যায্য স্বার্থ থাকতে হবে।
বাংলাদেশ কারও শত্রু নয়—বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থের পক্ষে।
সার্বভৌম বাংলাদেশ, মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ।
বন্ধুত্ব চাই—আধিপত্য নয়।
মন্তব্য করুন