হুজুর ও সাধারণ মানুষের জন্য আইনের প্রয়োগ নাকি দৃষ্টিভঙ্গির দ্বিচারিতা?
নেশন টুডে২৪ নিউজ ডেস্ক:
একটি দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় সবার জন্য সমান সুযোগ ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মহলে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে—আইন কি ব্যক্তিভেদে তার রূপ পরিবর্তন করছে?
অভিযোগ উঠেছে, অপরাধের ধরণ এক হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তির সামাজিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং গণমাধ্যমের ভূমিকায় এক ধরণের অদৃশ্য বৈষম্য বা দ্বিচারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
দুই চিত্রের বৈপরীত্য
সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি ভিন্ন পরিস্থিতির তুলনা করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে:
প্রথম চিত্র (ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা হুজুর):যখন কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা আলেম কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং তিনি নিজে সম্পূর্ণ দাবি করেন যে তিনি নির্দোষ, এমনকি নিজের সত্যতা প্রমাণে প্রয়োজনে ডিএনএ (DNA) টেস্ট** করানোর জোরালো আহ্বান জানান; তখন রাষ্ট্র বা তদন্তকারী সংস্থা অনেক সময় সেই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার দিকে না গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে রিমান্ডে পাঠিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় চিত্র (সাধারণ বা অ-হুজুর ব্যক্তি): অপরদিকে, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি কোনো সাধারণ বা তথাকথিত ‘নন-হুজুর’ শ্রেণীভুক্ত হন, এবং তিনি যদি নিজে মুখ ফুটে অপরাধ স্বীকারও করেন যে—”আমিই অপরাধী, আমিই খুনি বা ধর্ষক”—তখন অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে বলে, “না, মুখে স্বীকার করলেই হবে না, বৈজ্ঞানিক প্রমাণের জন্য ডিএনএ টেস্ট করাতে হবে।”
গণমাধ্যম ও জনমনে প্রশ্ন
জনগণের একটি বড় অংশের মতে, রাষ্ট্র ও আইন সবার জন্য এক হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির “পোশাক ও পরিচয়” একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অপরাধী অপরাধীই—তার কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয় থাকতে পারে না। কিন্তু কোনো আলেম বা হুজুর অভিযুক্ত হলেই মিডিয়া ট্রায়াল বা গণমাধ্যমে তাকে যেভাবে আগেই ‘অপরাধী’ হিসেবে উপস্থাপন করার এক ধরণের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, অন্য কোনো সাধারণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সেই চড়াও মনোভাব বা তৎপরতা দেখা যায় না। অনেক সময় অন্য ক্ষেত্রে মিডিয়া এক ধরণের রহস্যজনক নীরবতা পালন করে।
জনগণের প্রশ্ন: একই রাষ্ট্র, একই আইন এবং একই অপরাধের ধারা হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিভেদে এই আচরণ কেন? একজন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ডিএনএ টেস্ট চাইলে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে, আর অন্যজন অপরাধ স্বীকার করার পরও আইনের মারপ্যাঁচে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। এটা কি বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নাকি স্পষ্ট দ্বিচারিতা?
একটি নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার প্রত্যাশা
একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রে আইনের চোখ অন্ধ হওয়ার কথা, যার অর্থ আইনের কাছে সবাই সমান। অপরাধী যে-ই হোক—সে হুজুর হোক কিংবা অ-হুজুর—তার সঠিক তদন্ত বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ উপায়ে হওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয়কে টার্গেট করে আইন প্রয়োগের গতি বাড়ানো বা কমানো আইনের শাসনের পরিপন্থী।
জনগণ আশা করে, রাষ্ট্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দেশের মূলধারার গণমাধ্যম কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব বা পূর্বনির্ধারিত ধারণা (Prejudice) ছাড়াই প্রতিটি মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করবে, যাতে বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা
অটুট থাকে।
মন্তব্য করুন