ব্রেকিং নিউজ
নওমুসলিম মুহাম্মদ রাজ
২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

এই কওমি অঙ্গনের উপর বদনজর শত্রুদের আজকের নয়!!

এই কওমি অঙ্গনের উপর বদনজর শত্রুদের আজকের নয়!!

 

রাত বারোটা। একটা ছেলে বিছানায় শুয়ে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একের পর এক থাম্বনেইল। এক হুজুরের মুখের পাশে লাল তির চিহ্ন, আরেক হুজুরের ছবির উপর মোটা অক্ষরে লেখা কঠিন জবাব। ছেলেটা যে মাদরাসার ছাত্র, যে সকালে ওই উস্তাদের পেছনে নামাজ পড়ে, রাতে সে দেখছে তাঁর উস্তাদকে আরেকজন আলিম ছিঁড়ে ফেলছেন। ভোরে সে যখন ফজরের জন্য ওঠে, তার বুকের ভেতর আর আগের সেই শ্রদ্ধাটা থাকে না। এভাবেই একটা প্রজন্মের ঈমানের ভিতে ফাটল ধরে। বাইরের কেউ ধরায়নি। আমরা নিজেরাই ধরিয়েছি।

 

এই কওমি অঙ্গনের উপর বদনজর আজকের নয়। দেওবন্দের সেই ছাতিম গাছের নিচে যেদিন প্রথম হালকা বসেছিল, সেদিন থেকেই শত্রু বুঝে গিয়েছিল এই দুর্গ বাইরে থেকে ভাঙা যাবে না। কামান দিয়ে যাকে ভাঙা যায় না, তাকে ভাঙতে হয় ভেতর থেকে। তাই তারা কখনো তলোয়ার আনেনি, এনেছে সন্দেহ। কখনো কারাগার বানায়নি, বানিয়েছে বিভাজন। ইতিহাস সাক্ষী, এই ময়দানে যতবার আঘাত এসেছে, তার বড় অংশটাই এসেছে আমাদের নিজেদের হাত দিয়ে, আর শত্রু দূরে বসে হাততালি দিয়েছে।

 

অথচ আমাদের আকাবির যে পথে হেঁটেছেন, সে পথের নাম ছিল আদব। ইখতিলাফ তাঁদের ছিল না, এমন নয়। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মাসআলাগত মতভেদ ছিল। চার ইমামের মাঝে মতভেদ ছিল। কিন্তু সেই মতভেদ কখনো ব্যক্তিহত্যায় নামেনি। ইমাম শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মতের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ নিজের উস্তাদের সঙ্গে দ্বিমত করেছেন, কিন্তু জীবনভর তাঁর জন্য দোয়া করেছেন। তাঁদের কলম চলেছে কিতাবের পাতায়, জিহ্বা চলেনি হাটের মাঠে। তাঁরা জানতেন, দলিল দুর্বল হলে মানুষ ব্যক্তিকে আক্রমণ করে, আর দলিল শক্তিশালী হলে মানুষ চুপচাপ কিতাব লেখে।

 

আমাদের এই মাটিতেও সেই আলো ছিল। হাফেজ্জী হুজুর রহিমাহুল্লাহ কারও সমালোচনা শুনলে চোখ ভিজে যেত, বলতেন এই উম্মতের জন্য কাঁদো, বদনাম গেয়ো না। শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহিমাহুল্লাহ প্রকাশ্য ময়দানে যাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বিমত করতেন, ব্যক্তিগত মজলিসে তাঁর ইলমের প্রশংসা করতেন। সেই যুগে দুই বুজুর্গের মতভেদ হলে চিঠি চালাচালি হতো, মজলিস বসত, কখনো তৃতীয় কোনো মুরুব্বি মধ্যস্থতা করতেন। সমাধান হলে কেউ জানতও না যে কোনোদিন মতভেদ ছিল। আজ মতভেদ শুরু হওয়ার আগেই ক্যামেরা চালু হয়ে যায়।

 

সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এখন এই কাদা ছোড়াছুড়ির একটা বাজার তৈরি হয়েছে। একজন আলিমের সম্মান নিয়ে টান দিলে ভিউ বাড়ে, ভিউ বাড়লে টাকা আসে। ফলে গিবত হয়ে গেছে ব্যবসা, আর তোহমত হয়ে গেছে কনটেন্ট। যে জবান দিয়ে হাদিসের সনদ বর্ণিত হওয়ার কথা, সেই জবান এখন প্রতিপক্ষের নিয়ত মেপে দেয়। কে কার এজেন্ট, কে কত টাকা খেয়েছে, কে কোন গোপন বৈঠকে গিয়েছিল, এসব বলার সময় একবারও মনে পড়ে না যে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে থাকো, কেননা কিছু অনুমান পাপ, আর একে অন্যের গোপন দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না, আর একে অন্যের গিবত করো না। সুরা হুজুরাতের এই আয়াত আমরা দরসে পড়াই, বাস্তবে ভুলে যাই।

 

আল্লাহ তাআলা সুরা আনফালে সতর্ক করেছেন, তোমরা পরস্পরে বিবাদ করো না, তাহলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে। আয়াতটির শেষ শব্দটি বড় ভয়ংকর। শক্তি হারিয়ে যাওয়া। আজ কওমি অঙ্গনের হাতে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান আছে, লক্ষ লক্ষ ছাত্র আছে, কোটি মানুষের ভালোবাসা আছে, কিন্তু সম্মিলিত শক্তি নেই। কারণ যে শক্তি ঐক্যের মাটিতে জন্মায়, সেটা বিবাদের রোদে শুকিয়ে যায়।

 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে। তিনি আরও বলেছেন, তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না, সম্পর্ক ছিন্ন করো না, বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও। এই দুটি বাক্য যদি আমরা মেনে চলতাম, তাহলে আজ ইসলামবিদ্বেষী কোনো কলম আমাদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও লিখতে পারত না। কারণ তাদের সব উপাদান আমরাই সরবরাহ করি।

 

করণীয়টা কঠিন কিছু নয়। ইলমি ইখতিলাফ ইলমের ময়দানেই থাকুক। কিতাব লিখুন, প্রবন্ধ লিখুন, মজলিসে বসুন, প্রয়োজনে বন্ধ দরজায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাহাস করুন। কিন্তু ভাইয়ের ইজ্জত নিয়ে ইউটিউবের বাজারে দাঁড়াবেন না। কারও সম্পর্কে অভিযোগ শুনলে যাচাই করুন, ছড়িয়ে দেবেন না। কোনো আলিমের ভুল হলে তাঁর কাছে যান, তাঁর অনুপস্থিতিতে দশজনের কাছে যাবেন না। আর তরুণ তালিবুল ইলমদের বলছি, যে মজলিস আপনার অন্তর থেকে উলামায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা কমিয়ে দেয়, সে মজলিস যত বড় নামেই হোক, সেখান থেকে উঠে আসুন।

 

আমরা মনে রাখি, কিয়ামতের দিন কেউ জিজ্ঞাসিত হবে না যে আপনি কোন গ্রুপের ছিলেন। জিজ্ঞাসা হবে, আপনার জবান দিয়ে কার হৃদয় রক্তাক্ত হয়েছিল। যে হাত দিয়ে হাদিসের কিতাব ধরেছি, সেই হাত দিয়ে যেন ভাইয়ের গায়ে কাদা না লাগে। আল্লাহ আমাদের এই অঙ্গনকে হিফাজত করুন, আমাদের বুজুর্গদের আদব আমাদের অন্তরে ফিরিয়ে দিন, আর যে বদনজর যুগ যুগ ধরে এই কাফেলার পেছনে লেগে আছে, তা থেকে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। আমিন।

 

নওমুসলিম মুহাম্মদ রাজ

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঈদগাহ মডেল হাসপাতালের নিজস্ব তহবিল থেকে অসহায় রোগীদের ১১.৮১ লাখ টাকা সহায়তা।

১

রুমায় স্বজাতি কর্তৃক ধ/র্ষণের শিকার ১৫ বছরের মারমা শিশু। প্রতিবাদ করতে গিয়ে বাড়ি ছাড়া পরিবার।

২

আমার দেখা শ্রীলংকা: প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও বিস্ময়ের এক অপূর্ব দ্বীপ

৩

বিয়ের আগে যাচাই-বাছাইয়ের আহ্বান: ধর্মান্তরিত মুসলিমদের ক্ষেত্রেও দ্বীন ও চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ

৪

আলীকদমের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষক সংকট

৫

চিকিৎসার বিনিময়ে ধর্মান্তরের অভিযোগ নাকচ করলেন ডা. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী

৬

পশ্চিমারা কেন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে?

৭

প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভনে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, আলীকদমে প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

৮

ইসলাম গ্রহণের পর হুমকির অভিযোগ, পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

৯

মক্কা চুক্তি: ‘ইসলামি ন্যাটো’ নয়, ঢাকার জন্য নিশ্চিত নিরাপত্তাও নয়!

১০

আলীকদমের উন্নয়ন নিয়ে বিতর্ক: রিমনের কর্মের মূল্যায়ন হোক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে

১১

প্রাচীন আরাকানে মুসলিম সভ্যতা: ইতিহাস, দলিল ও প্রমাণভিত্তিক আলোচনা

১২

২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসে বিবৃতি দিয়েছে এআরএসএ

১৩

আইভরি কোস্টে নিহত ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর ২০তম শাহাদাত বার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা

১৪

বাংলাদেশে কখন ইসলাম প্রচার শুরু হয়?

১৫

ভারতীয় প্রভাবমুক্ত ও সমমর্যাদার সম্পর্ক: বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ ও করণী

১৬

অশান্ত পাহাড়ে শান্তির পথ: নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নে সরকারের দায়িত্ব

১৭

এইচএসসি পরীক্ষার্থী নিখোঁজ, থানায় জিডি

১৮

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু, শিখ ও জৈনদের ৬ মাসের মধ্যে নাগরিকত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার অমিত শাহের

১৯

আলীকদমে টমটমকে সাইড দিতে গিয়ে খাদে মাতামুহুরী পরিবহনের বাস

২০