এই কওমি অঙ্গনের উপর বদনজর শত্রুদের আজকের নয়!!
রাত বারোটা। একটা ছেলে বিছানায় শুয়ে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একের পর এক থাম্বনেইল। এক হুজুরের মুখের পাশে লাল তির চিহ্ন, আরেক হুজুরের ছবির উপর মোটা অক্ষরে লেখা কঠিন জবাব। ছেলেটা যে মাদরাসার ছাত্র, যে সকালে ওই উস্তাদের পেছনে নামাজ পড়ে, রাতে সে দেখছে তাঁর উস্তাদকে আরেকজন আলিম ছিঁড়ে ফেলছেন। ভোরে সে যখন ফজরের জন্য ওঠে, তার বুকের ভেতর আর আগের সেই শ্রদ্ধাটা থাকে না। এভাবেই একটা প্রজন্মের ঈমানের ভিতে ফাটল ধরে। বাইরের কেউ ধরায়নি। আমরা নিজেরাই ধরিয়েছি।
এই কওমি অঙ্গনের উপর বদনজর আজকের নয়। দেওবন্দের সেই ছাতিম গাছের নিচে যেদিন প্রথম হালকা বসেছিল, সেদিন থেকেই শত্রু বুঝে গিয়েছিল এই দুর্গ বাইরে থেকে ভাঙা যাবে না। কামান দিয়ে যাকে ভাঙা যায় না, তাকে ভাঙতে হয় ভেতর থেকে। তাই তারা কখনো তলোয়ার আনেনি, এনেছে সন্দেহ। কখনো কারাগার বানায়নি, বানিয়েছে বিভাজন। ইতিহাস সাক্ষী, এই ময়দানে যতবার আঘাত এসেছে, তার বড় অংশটাই এসেছে আমাদের নিজেদের হাত দিয়ে, আর শত্রু দূরে বসে হাততালি দিয়েছে।
অথচ আমাদের আকাবির যে পথে হেঁটেছেন, সে পথের নাম ছিল আদব। ইখতিলাফ তাঁদের ছিল না, এমন নয়। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মাসআলাগত মতভেদ ছিল। চার ইমামের মাঝে মতভেদ ছিল। কিন্তু সেই মতভেদ কখনো ব্যক্তিহত্যায় নামেনি। ইমাম শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মতের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ নিজের উস্তাদের সঙ্গে দ্বিমত করেছেন, কিন্তু জীবনভর তাঁর জন্য দোয়া করেছেন। তাঁদের কলম চলেছে কিতাবের পাতায়, জিহ্বা চলেনি হাটের মাঠে। তাঁরা জানতেন, দলিল দুর্বল হলে মানুষ ব্যক্তিকে আক্রমণ করে, আর দলিল শক্তিশালী হলে মানুষ চুপচাপ কিতাব লেখে।
আমাদের এই মাটিতেও সেই আলো ছিল। হাফেজ্জী হুজুর রহিমাহুল্লাহ কারও সমালোচনা শুনলে চোখ ভিজে যেত, বলতেন এই উম্মতের জন্য কাঁদো, বদনাম গেয়ো না। শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহিমাহুল্লাহ প্রকাশ্য ময়দানে যাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বিমত করতেন, ব্যক্তিগত মজলিসে তাঁর ইলমের প্রশংসা করতেন। সেই যুগে দুই বুজুর্গের মতভেদ হলে চিঠি চালাচালি হতো, মজলিস বসত, কখনো তৃতীয় কোনো মুরুব্বি মধ্যস্থতা করতেন। সমাধান হলে কেউ জানতও না যে কোনোদিন মতভেদ ছিল। আজ মতভেদ শুরু হওয়ার আগেই ক্যামেরা চালু হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এখন এই কাদা ছোড়াছুড়ির একটা বাজার তৈরি হয়েছে। একজন আলিমের সম্মান নিয়ে টান দিলে ভিউ বাড়ে, ভিউ বাড়লে টাকা আসে। ফলে গিবত হয়ে গেছে ব্যবসা, আর তোহমত হয়ে গেছে কনটেন্ট। যে জবান দিয়ে হাদিসের সনদ বর্ণিত হওয়ার কথা, সেই জবান এখন প্রতিপক্ষের নিয়ত মেপে দেয়। কে কার এজেন্ট, কে কত টাকা খেয়েছে, কে কোন গোপন বৈঠকে গিয়েছিল, এসব বলার সময় একবারও মনে পড়ে না যে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে থাকো, কেননা কিছু অনুমান পাপ, আর একে অন্যের গোপন দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না, আর একে অন্যের গিবত করো না। সুরা হুজুরাতের এই আয়াত আমরা দরসে পড়াই, বাস্তবে ভুলে যাই।
আল্লাহ তাআলা সুরা আনফালে সতর্ক করেছেন, তোমরা পরস্পরে বিবাদ করো না, তাহলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে। আয়াতটির শেষ শব্দটি বড় ভয়ংকর। শক্তি হারিয়ে যাওয়া। আজ কওমি অঙ্গনের হাতে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান আছে, লক্ষ লক্ষ ছাত্র আছে, কোটি মানুষের ভালোবাসা আছে, কিন্তু সম্মিলিত শক্তি নেই। কারণ যে শক্তি ঐক্যের মাটিতে জন্মায়, সেটা বিবাদের রোদে শুকিয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে। তিনি আরও বলেছেন, তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না, সম্পর্ক ছিন্ন করো না, বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও। এই দুটি বাক্য যদি আমরা মেনে চলতাম, তাহলে আজ ইসলামবিদ্বেষী কোনো কলম আমাদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও লিখতে পারত না। কারণ তাদের সব উপাদান আমরাই সরবরাহ করি।
করণীয়টা কঠিন কিছু নয়। ইলমি ইখতিলাফ ইলমের ময়দানেই থাকুক। কিতাব লিখুন, প্রবন্ধ লিখুন, মজলিসে বসুন, প্রয়োজনে বন্ধ দরজায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাহাস করুন। কিন্তু ভাইয়ের ইজ্জত নিয়ে ইউটিউবের বাজারে দাঁড়াবেন না। কারও সম্পর্কে অভিযোগ শুনলে যাচাই করুন, ছড়িয়ে দেবেন না। কোনো আলিমের ভুল হলে তাঁর কাছে যান, তাঁর অনুপস্থিতিতে দশজনের কাছে যাবেন না। আর তরুণ তালিবুল ইলমদের বলছি, যে মজলিস আপনার অন্তর থেকে উলামায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা কমিয়ে দেয়, সে মজলিস যত বড় নামেই হোক, সেখান থেকে উঠে আসুন।
আমরা মনে রাখি, কিয়ামতের দিন কেউ জিজ্ঞাসিত হবে না যে আপনি কোন গ্রুপের ছিলেন। জিজ্ঞাসা হবে, আপনার জবান দিয়ে কার হৃদয় রক্তাক্ত হয়েছিল। যে হাত দিয়ে হাদিসের কিতাব ধরেছি, সেই হাত দিয়ে যেন ভাইয়ের গায়ে কাদা না লাগে। আল্লাহ আমাদের এই অঙ্গনকে হিফাজত করুন, আমাদের বুজুর্গদের আদব আমাদের অন্তরে ফিরিয়ে দিন, আর যে বদনজর যুগ যুগ ধরে এই কাফেলার পেছনে লেগে আছে, তা থেকে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। আমিন।
নওমুসলিম মুহাম্মদ রাজ
মন্তব্য করুন