ব্রেকিং নিউজ
NationToday 24
১৮ মে ২০২৬, ২:৪৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

খ্রিষ্টান মিশনারির ছাত্র থেকে ‘সাইফুল ইসলাম’: এক নওমুসলিমের সত্যের পথে ফেরার রোমাঞ্চকর গল্প

খ্রিষ্টান মিশনারির ছাত্র থেকে ‘সাইফুল ইসলাম’: এক নওমুসলিমের সত্যের পথে ফেরার রোমাঞ্চকর গল্প

​নিজস্ব প্রতিবেদক, নেশন টুডে২৪

কক্সবাজার/চকরিয়া:

​মিশনারি স্কুলের জীবন, সহপাঠী মুসলিম বন্ধুর চমৎকার আচরণ, সত্যের সন্ধান এবং পরবর্তীতে পরিবারের চরম নির্যাতন ও সমাজচ্যুত হওয়ার কঠিন এক অগ্নিপরীক্ষা। সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে অন্ধকারের পথ ছেড়ে ইসলামের আলোয় আলোকিত হলেন এক উপজাতি তরুণ। খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচারকের ছেলে থেকে তিনি এখন আলহামদুলিল্লাহ একজন গর্বিত মুসলিম—মো. সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরা।

​সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সেই দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য সংগ্ৰামের সত্য কাহিনী তুলে ধরেছেন সাইফুল। তার সেই রোমাঞ্চকর পথচলার গল্প আজ হাজারো মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে।

​বন্ধুত্বের হাত ধরে সত্যের আলো

​সাইফুল ইসলামের শৈশব কেটেছিল বাড়ি থেকে দূরে এক খ্রিষ্টান মিশনারিতে। সেখানে থেকে পাশের একটি স্কুলে পড়াশোনা করতেন তিনি। ক্লাসে হিন্দু, খ্রিষ্টান ও মুসলিম সব ধর্মের শিক্ষার্থীরা একসাথে পড়লেও, সাইফুলের সবচেয়ে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এক মুসলিম সহপাঠীর সাথে। সেই বন্ধুই পরম মমতায় বাড়ি থেকে সাইফুলের জন্য নাস্তা নিয়ে আসতো, টিফিনের সময় নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ভাত খাওয়াতো।

​দুই বছরের মাথায় সেই বন্ধুই সাইফুলকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করে এবং মহানবী (সা.)-এর আদর্শ সম্পর্কে বোঝাতে থাকে। একদিন দুপুরের বিরতিতে বন্ধুর সাথে মসজিদে গিয়ে সাইফুল ইসলামের সৌন্দর্য প্রথম প্রত্যক্ষ করেন। তিনি খেয়াল করেন, খ্রিষ্টান ধর্মে পবিত্র বাইবেল হাতে নিয়েও অনেকে যেখানে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে এবং পবিত্রতার তোয়াক্কা না করে গির্জায় ঢোকে; সেখানে মুসলিমরা মসজিদে ঢোকার আগে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বসেন, পানি ব্যবহার করেন এবং ওজু করে পরম পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর দরবারে হাজির হন। এই পবিত্রতাই প্রথম সাইফুলের মনে দাগ কাটে।

​ঘরছাড়া ও নির্মম নির্যাতনের দিনগুলো

​পড়াশোনা শেষে বাড়ি ফিরে আসার পর সাইফুলের মনে মনে ইসলাম গ্রহণের তীব্র ইচ্ছা থাকলেও খ্রিষ্টান প্রচারক বাবার ভয়ে তিনি মুখ খুলতে পারছিলেন না। তবে স্থানীয় বাঙালি মুসলমানদের সাথে মেলামেশা শুরু করায় বাবার সন্দেহের তীর ধেয়ে আসে তার দিকে।

​একদিন মেম্বার পদপ্রার্থী বাবা ক্ষিপ্ত হয়ে সাইফুলকে ঘর থেকে বের করে দেন। ভিজা কাপড়ে হালকা বৃষ্টি আর তীব্র শীতের রাতে ১০টা পর্যন্ত বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার পর, একপর্যায়ে বাবা দা নিয়ে তাকে কাটতে আসেন। জীবন বাঁচাতে সেদিন রাতে এক পরিত্যক্ত মুরগির ঘরে আশ্রয় নেন সাইফুল। পরদিন সকালে পাড়ার লোকদের সহযোগিতায় বাবা তাকে ধরে গাছের সাথে বেঁধে মারধর করার চেষ্টা করলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে চকরিয়া চলে আসেন।

​জঙ্গল থেকে রাবার বাগান: বেঁচে থাকার লড়াই

​চকরিয়া এসে শুরু হয় পেটের দায়ে সাইফুলের বেঁচে থাকার অন্য এক সংগ্ৰাম। চনামুড়ির দোকানে কাজ না পেয়ে চলে যান গভীর জঙ্গলে জেঠাতো ভাইদের সাথে বাঁশ কাটার কাজে। টানা দুই দিন শুধু পানি খেয়ে, তীব্র শারীরিক কষ্ট সহ্য করে ৯ দিন কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে একটি টাকাও মজুরি দেওয়া হয়নি।

​এরপর শীতের শুরুতে এক মুসলিম ভদ্রলোকের জমিতে সামান্য পকেট খরচে কাজ নেন সাইফুল, উদ্দেশ্য ছিল শুধু রাত কাটানোর একটা নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু ৩ মাস পর বাবা সেখানেও লোকবল নিয়ে সাইফুলকে মারতে আসলে বাড়ির মালিক নিরুপায় হয়ে তাকে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় দেন।

​সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথে দেখা হয় আরেক মানবিক ব্যক্তির সাথে। তিনি সাইফুলকে নিজের রাবার বাগানে কাজের সুযোগ দেন। দীর্ঘ ৭ মাস পরম স্নেহে আগলে রেখে সাইফুলকে ইসলামের নানা দিক বোঝাতে থাকেন এবং এক শুভক্ষণে সাইফুলকে কালেমা শাহাদাত পাঠ করান।

​ডাঃ মোঃ ইউসুফ আলীর অবদান ও নতুন জীবনের সূচনা

​ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর সাইফুলকে সুন্নতে খৎনা এবং তাবলিগে পাঠানোর জন্য সেই বাগানের মালিক যোগাযোগ করেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ মোঃ ইউসুফ আলীর সাথে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সাইফুলের অপারেশন ও ঔষধের ব্যবস্থা করেন এই মানবতাবাদী চিকিৎসক। শুধু তাই নয়, কক্সবাজার ইজতেমা থেকে সাইফুলের ৩ চিল্লার নিয়তে বের হওয়ার সমস্ত খরচও বহন করেন তিনি।

​১ চিল্লা শেষ হতেই সাইফুলের বাবা পুনরায় বাধা সৃষ্টি করেন এবং সেনাবাহিনীর কাছে বিচার দেন। সেই বিচারে নিজের মা-বাবার কাছ থেকে ত্যাজ্য পুত্র ঘোষিত হন সাইফুল। তবে আল্লাহ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়েননি। অভিভাবকহীন সাইফুলের আজীবনের অভিভাবক হয়ে পাশে দাঁড়ান ডাঃ মোঃ ইউসুফ আলী। বর্তমানে সাইফুল ইসলাম সেই ডাক্তারের হাসপাতালেই নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন।

​শেষ কথা

​কঠিন সব বাধা এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেও ইসলামের পথে অবিচল থাকা নওমুসলিম মো. সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরা মহান আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ধৈর্য ধারণের ফল যে কত মধুর হয়, সাইফুল ইসলাম আজ তার জীবন্ত প্রমাণ। সাইফুল ইসলামের এই ত্যাগ ও সংগ্ৰামের গল্প বর্তমান সমাজের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।

​নেশন টুডে২৪ ডটকম / ২০২৬

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঈদগাহ মডেল হাসপাতালের নিজস্ব তহবিল থেকে অসহায় রোগীদের ১১.৮১ লাখ টাকা সহায়তা।

১

রুমায় স্বজাতি কর্তৃক ধ/র্ষণের শিকার ১৫ বছরের মারমা শিশু। প্রতিবাদ করতে গিয়ে বাড়ি ছাড়া পরিবার।

২

আমার দেখা শ্রীলংকা: প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও বিস্ময়ের এক অপূর্ব দ্বীপ

৩

বিয়ের আগে যাচাই-বাছাইয়ের আহ্বান: ধর্মান্তরিত মুসলিমদের ক্ষেত্রেও দ্বীন ও চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ

৪

আলীকদমের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষক সংকট

৫

চিকিৎসার বিনিময়ে ধর্মান্তরের অভিযোগ নাকচ করলেন ডা. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী

৬

পশ্চিমারা কেন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে?

৭

প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভনে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, আলীকদমে প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

৮

ইসলাম গ্রহণের পর হুমকির অভিযোগ, পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

৯

মক্কা চুক্তি: ‘ইসলামি ন্যাটো’ নয়, ঢাকার জন্য নিশ্চিত নিরাপত্তাও নয়!

১০

আলীকদমের উন্নয়ন নিয়ে বিতর্ক: রিমনের কর্মের মূল্যায়ন হোক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে

১১

প্রাচীন আরাকানে মুসলিম সভ্যতা: ইতিহাস, দলিল ও প্রমাণভিত্তিক আলোচনা

১২

২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসে বিবৃতি দিয়েছে এআরএসএ

১৩

আইভরি কোস্টে নিহত ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর ২০তম শাহাদাত বার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা

১৪

বাংলাদেশে কখন ইসলাম প্রচার শুরু হয়?

১৫

ভারতীয় প্রভাবমুক্ত ও সমমর্যাদার সম্পর্ক: বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ ও করণী

১৬

অশান্ত পাহাড়ে শান্তির পথ: নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নে সরকারের দায়িত্ব

১৭

এইচএসসি পরীক্ষার্থী নিখোঁজ, থানায় জিডি

১৮

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু, শিখ ও জৈনদের ৬ মাসের মধ্যে নাগরিকত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার অমিত শাহের

১৯

আলীকদমে টমটমকে সাইড দিতে গিয়ে খাদে মাতামুহুরী পরিবহনের বাস

২০