হেযবুত তওহীদ’: ইসলামের নামে চরম বিভ্রান্তি ও বিকৃত আক্বীদার এক ভয়ংকর সংগঠন
**নেশন টুডে২৪ নিউজ ডেস্ক:** বাংলাদেশ ভিত্তিক ‘হেযবুত তওহীদ’ একটি চরম পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় সংগঠন। ইসলামের ভুল ও বিকৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কারণে ২০০৮ সালেই বাংলাদেশ সরকার এই সংগঠনটিকে কালো তালিকাভুক্ত করে।
১৯৯৫ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়ার পন্নী পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ বায়াযিদ খান পন্নী (১৯২৫-২০১২ খ্রি.) এই দলটির সূচনা করেন। পেশায় রাজনীতিক, শিকারী ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পন্নী প্রথম জীবনে ব্রিটিশবিরোধী ‘খাকসার’ আন্দোলনে যোগ দিলেও পরবর্তীতে নির্জন জীবন বেছে নেন এবং এক পর্যায়ে দাবি করেন— বর্তমান ইসলাম ‘বিকৃত ইসলাম’ এবং তিনিই কেবল ‘প্রকৃত ইসলাম’-এর পথপ্রদর্শক।
ইমাম দাবি ও কথিত ‘মো‘জেযা’র ধোঁকা
বায়াযিদ খান পন্নী নিজেকে এই যুগের ইমাম বা ‘এমামুয্যামান’ হিসেবে দাবি করতেন। তার অনুসারীদের বিশ্বাস, আল্লাহ পন্নীকে এই যুগে মানবজাতির একমাত্র ত্রাতা হিসেবে পাঠিয়েছেন। পৃথিবীর একশ বিশ কোটি মুসলমানের মধ্যে কেবল তার দলভুক্ত ৫ লক্ষ মানুষকেই তিনি ‘প্রকৃত মুসলমান’ মনে করতেন।
পন্নী নিজেকে পরোক্ষভাবে নবী দাবির মতো ধৃষ্টতাও দেখিয়েছেন। নিজের একটি ১০ মিনিটের সাধারণ ভাষণকে আল্লাহর ‘মো‘জেযা’ (অলৌকিক ঘটনা) দাবি করে তিনি বলেন, আল্লাহ এই ভাষণের মাধ্যমে একই সাথে ৮টি মো‘জেযা ঘটিয়ে হেযবুত তওহীদকে ‘হক’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাদের গঠনতন্ত্রে এই ভাষণকে পবিত্র কুরআনের সমকক্ষ মর্যাদা দিয়ে বলা হয়েছে:
“কোরআন ও ইমামের এই ভাষণটি একই পর্যায়ভুক্ত। যারা বায়াযিদ খান পন্নীর উপর আল্লাহ প্রদত্ত এই মো‘জেযায় বিশ্বাস করবে না এবং এতে সন্দেহ রাখবে, তারা কুরআনকে অবিশ্বাস করার মত অপরাধী এবং তাদের জন্য উভয় জাহানে রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।”
প্রচলিত ইসলাম ও আলেম-ওলামার প্রতি চূড়ান্ত বিদ্বেষ
হেযবুত তওহীদের দাবি অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর একশত বছরের মধ্যেই ইসলাম বিকৃত হয়ে গেছে এবং দীর্ঘ ১৩শ বছর পর আল্লাহ পন্নীকে প্রকৃত ইসলাম বোঝার তাওফীক দিয়েছেন।
* **আলাদা ইবাদত ও সমাজবিচ্ছিন্নতা:** এই দলের সদস্যরা অন্য সাধারণ মুসলমানদের সাথে ছালাত আদায় করে না এবং কোনো ইবাদতেও অংশ নেয় না। তাদের শপথবাক্য অনুযায়ী, বাকি দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান পথভ্রষ্ট।
* **ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরোধিতা:** দলটি আলেম-ওলামাদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে। তারা মনে করে হাদীছ, তাফসীর ও ফিকহ শাস্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই, বরং এগুলো মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির কারণ।
* **জান্নাতের নিশ্চিত গ্যারান্টি:** পন্নীর দাবি অনুযায়ী, তাদের দলে যোগ দিলেই ‘দুই শহীদের মর্যাদা’ পাওয়া যাবে এবং তাদের জন্য জান্নাত নিশ্চিত!
দাজ্জাল ও ছালাতের বিকৃত ব্যাখ্যা
ইসলামী আক্বীদা অনুযায়ী দাজ্জাল একটি জীবন্ত সত্তা হলেও, হেযবুত তওহীদের মতে দাজ্জাল কোনো প্রাণী নয়, বরং ‘ইহুদী-খৃষ্টান যান্ত্রিক সভ্যতা’। তারা নিজেদের পুরুষ ও নারী সদস্যদের যথাক্রমে ‘মোজাহিদ’ ও ‘মোজাহিদা’ বলে এবং দাবি করে যে, তাদের মৃত লাশ নাকি কখনো শক্ত বা শীতল হয় না!
তাদের মতে, ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ বা যাকাত কোনো মূল ইবাদত নয়; বরং এগুলো কেবল জীবন পরিচালনার কিছু নিয়ম।
* **সামরিক স্টাইলে ছালাত:** ছালাতকে তারা কেবল ‘জিহাদের সামরিক প্রশিক্ষণ’ মনে করে। এর ফলে তারা সামরিক কুচকাওয়াজের মতো সটান ও দ্রুতগতিসম্পন্ন সম্পূর্ণ নতুন ও মনগড়া এক নামাজ পদ্ধতি চালু করেছে।
* **হজ্জ নিয়ে বিভ্রান্তি:** হজ্জকে তারা কোনো ইবাদত বা আধ্যাত্মিক বিষয় মনে করে না, বরং এটিকে একটি ‘আন্তর্জাতিক কনফারেন্স’ বা বাৎসরিক রাজনৈতিক সম্মেলন মনে করে।
ধর্মীয় লেবাস ও সংস্কৃতির বিরোধিতা
সংগঠনটির মতে দাড়ি, টুপি বা বোরকা ইসলামের কোনো লেবাসই নয়। এছাড়া তারা চরম ‘ধর্মীয় বহুত্ববাদে’ বিশ্বাসী। তাদের দাবি— রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোনো ধর্মকে বাতিল করেননি, তাই সব ধর্মই সত্য এবং সবার উপরে মানবতা।
দেশবাসীকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান
বর্তমানে এই বিভ্রান্তিকর সংগঠনটি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ‘দৈনিক দেশের পত্র’ ও ‘দৈনিক বজ্রকণ্ঠ’ নামক পত্রিকার মাধ্যমে তাদের এই বিকৃত আক্বীদা ও আমল ব্যাপকভাবে প্রচার করছে। এর ফলে দেশের বহু সরলমনা মানুষ প্রতিনিয়ত পথভ্রষ্ট হচ্ছে।
ইসলামের মূল ধারা ও তাওহীদের অবমাননাকারী এই চরমপন্থী ও বিকৃত মনা সংগঠনটির অপতৎপরতা সম্পর্কে দেশের প্রতিটি মুসলমান এবং সচেতন নাগরিককে সতর্ক থাকার
আহ্বান জানানো হচ্ছে।
মন্তব্য করুন