ওমানে ৪ বাংলাদেশি ভাইয়ের রহস্যময় মৃত্যু: কারণ কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া, নিশ্চিত করল রয়্যাল ওমান পুলিশ
বিশেষ প্রতিনিধি, নেশন টুডে২৪
মাসকাট, ওমান:
ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ি থেকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার একই পরিবারের চার প্রবাসী ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করেছে ওমান পুলিশ। রয়্যাল ওমান পুলিশের (ROP) দেওয়া সর্বশেষ তথ্য এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকা অবস্থায় এক্সহস্ট পাইপ থেকে নির্গত অত্যন্ত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড (CO) গ্যাস কেবিনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ায় দমবন্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত চার ভাই হলেন— মোহাম্মদ রাশেদ, মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ সিরাজ এবং মোহাম্মদ শহীদুল। তারা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালনগর ইউনিয়নের বন্দররাজা পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। এদের মধ্যে দুই ভাইয়ের আজই (১৫ মে) বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। বাড়ি ফেরার আনন্দ বিষাদে রূপ নিয়ে চার ভাইয়ের একসাথেই চিরবিদায়ের এই ঘটনায় ওমান প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং দেশের গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
যেভাবে ঘটল এই মর্মান্তিক ঘটনা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাতে চার ভাই একসাথে ঈদের ও পারিবারিক কেনাকাটার জন্য গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন। ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহ যাওয়ার পথে তারা সবাই অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। রাত ৮টার পর এক ভাই তার ওমানে থাকা আত্মীয়ের কাছে একটি ভয়েস মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠান। সেখানে তিনি অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে জানান যে, তারা সবাই প্রচণ্ড অসুস্থ বোধ করছেন এবং গাড়ি থেকে নামার মতো শক্তিও তাদের শরীরে নেই।
পরবর্তীতে মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকের সামনে গাড়িটি পার্ক করা অবস্থায় স্থানীয় প্রবাসীরা তাদের অচেতন দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে চারজনকে উদ্ধার করলেও ততক্ষণে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
কেন এবং কীভাবে কাজ করে এই ‘সাইলেন্ট কিলার’ গ্যাস?
ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে রহস্যময় বা ঘোলাটে মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধ গাড়িতে কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু মারাত্মক একটি দুর্ঘটনা।
লক্ষণহীন বিষাক্ত গ্যাস: কার্বন মনোক্সাইড (CO) এমন একটি গ্যাস যার কোনো রং বা গন্ধ নেই। ফলে গাড়ির এসি চালু রেখে বা কাচ বন্ধ করে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে ইঞ্জিন বা এক্সহস্ট পাইপের লিকেজ দিয়ে এই গ্যাস ভেতরে ঢুকলে মানুষ বুঝতেই পারে না।
শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি: এই গ্যাস ফুসফুসের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করলে রক্তের অক্সিজেন বহনকারী উপাদান ‘হিমোগ্লোবিন’-এর সাথে মিশে ‘কার্বোক্সিহিমোগ্লোবিন’ তৈরি করে। ফলে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
অসারতা ও অবশ হয়ে যাওয়া: গ্যাসটি শরীরে প্রবেশের পর প্রথম দিকে সামান্য মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম লাগলেও, খুব দ্রুত এটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে অবশ করে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারলেও তার হাত-পা নাড়ানোর বা গাড়ি থেকে নেমে দরজা খোলার মতো ন্যূনতম শারীরিক শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না।
ওমান পুলিশ এবং দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যেন কেউ কখনোই দীর্ঘসময় গাড়ির সব কাচ বন্ধ করে এসি চালিয়ে ভেতরে ঘুমিয়ে না পড়েন বা দীর্ঘক্ষণ বসে না থাকেন। প্রয়োজনে সামান্য সময়ের জন্য হলেও গাড়ির জানালা খুলে ভেতরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে নিহত চার ভাইয়ের মরদেহ স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মরদেহগুলো বাংলাদেশে পরিবারের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে ওমানের চট্টগ্রাম
সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মন্তব্য করুন