বিশেষ প্রতিবেদন | নেশন টুডে২৪
১০০০ দিনের যুদ্ধ, ১ কোটি ৪০ লাখ বাস্তুচ্যুত: তাওয়িলার আমিনা কি পারবেন তাঁর সন্তানকে বাঁচাতে?
খার্টুম ও আল-দাব্বাহ ব্যুরো:
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল যখন খার্টুমের আকাশে প্রথম যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা গিয়েছিল, তখন দারফুরের তাওয়িলা গ্রামের বাসিন্দা আমিনা (২৮) ভেবেছিলেন—এ যুদ্ধ বড়জোর কয়েক সপ্তাহ চলবে। আজ ২০২৬ সালের মে মাস। সুদানের গৃহযুদ্ধ পার করেছে ১,০০০ দিনের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সময়সীমা। কয়েক সপ্তাহের সেই আশা আজ পরিণত হয়েছে তিন বছরের অন্তহীন নরকে।
আজ আমিনার সেই সাজানো মাটির ঘর নেই, ঘরের সামনের প্রিয় বরই গাছটি পুড়ে ছাই, আর তাঁর স্বামী ইউসুফ নিখোঁজ। উত্তর সুদানের আল-দাব্বাহ শরণার্থী শিবিরের একটি প্লাস্টিকের তাঁবুর নিচে বসে আমিনা এখন লড়াই করছেন তাঁর সাড়ে তিন বছরের সন্তান ইব্রাহিমকে বাঁচানোর জন্য। যে শিশুটি তীব্র অপুষ্টির কারণে আজ মৃত্যুর মুখোমুখি।
পরিসংখ্যানের আড়ালে এক মানবিক বিপর্যয়
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় অফিসের (OCHA) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সুদানের বর্তমান পরিস্থিতি যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক। নিচে সুদানের বাস্তব চিত্রটি ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
ফ্যাক্ট-শিট: সুদান যুদ্ধ ও মানবিক সংকট ২০২৬
সংকটের সময়কাল: ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে বর্তমান (মে ২০২৬ পর্যন্ত, যুদ্ধ ১,০০০ দিন অতিক্রম করেছে)।
প্রধান উপদ্রুত এলাকা: খার্টুম, দারফুর (তাওয়িলা, এল ফাশের, উম বারু, আল-দাইন) এবং কোর্দোফান (কাদুগলি, দিল্লিং)।
জনসংখ্যা ও বাস্তুচ্যুতি
মোট বাস্তুচ্যুত: ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ (বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতি সংকট)।
শরণার্থী শিবিরের উদাহরণ: উত্তর সুদানের আল-দাব্বাহ শিবির, যেখানে দারফুর ও কোর্দোফান থেকে আসা প্রায় ৮০,০০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
খাদ্য ও পুষ্টি সংকট (দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি)
ক্ষুধার্ত জনসংখ্যা: ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ (সুদানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি)।
শিশু অপুষ্টি: উত্তর দারফুরের উম বারু অঞ্চলে ৫৩% শিশু চরম অপুষ্টির শিকার (যা আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থার সীমার চেয়ে ৩ গুণ বেশি)।
দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে থাকা শহর: কাদুগলি এবং দিল্লিং (দীর্ঘ অবরোধের কারণে মে ২০২৬-এর মধ্যে সম্পূর্ণ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি)।
আন্তর্জাতিক তহবিল ও সহায়তা ঘাটতি
২০২৬ সালের আর্থিক চাহিদা: ২৯০ কোটি (২.৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার।
বর্তমান তহবিল প্রাপ্তি: প্রয়োজনীয় চাহিদার মাত্র ১৪% পূরণ হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামো ধ্বংস (সাম্প্রতিক ৪ মাস)
বেসামরিক প্রাণহানি (এল ফাশের): গত নভেম্বরে এল ফাশের শহর দখলের মাত্র ৩ দিনে অন্তত ২৭,০০০ সুদানি নিহত হন।
বাজার ও বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলা: গত ৪ মাসে অন্তত ২৮টি স্থানীয় বাজারে হামলা হয়েছে।
চিকিৎসা খাতে বিপর্যয়: গত ৪ মাসে অন্তত ১২টি হাসপাতালে সরাসরি সামরিক হামলা চালানো হয়েছে।
এল ফাশেরের সেই তিন দিন এবং একটি পরিবারের ধ্বংস হওয়া
গত নভেম্বরে উত্তর দারফুরের কৌশলগত শহর এল ফাশের দখলের লড়াইয়ের সময় আমিনার জীবন চিরতরে বদলে যায়। দারফুরের গভর্নর মিনি মিনাওয়ি মিডল ইস্ট আই-কে নিশ্চিত করেছিলেন যে, ওই মাত্র তিন দিনের ভারী সংঘর্ষে অন্তত ২৭ হাজার সুদানি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
আমিনার স্বামী ইউসুফও সেই ২৭ হাজারের একজন, যিনি বাজার থেকে আর ঘরে ফেরেননি। আমিনা বলেন—
“ইউসুফ হয়তো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি সংখ্যা মাত্র, কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন পুরো পৃথিবী। আমি তাঁর লাশটা পর্যন্ত চোখে দেখিনি, কবরে একমুঠো মাটি দেওয়ার সুযোগটুকুও মেলেনি।”
গোলাগুলির শব্দ আর ধোঁয়ার মধ্যে ছোট ইব্রাহিমকে কোলে নিয়ে শুধু পরনের কাপড়টুকু সম্বল করে আল-দাব্বাহ শিবিরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন আমিনা। পেছনে পড়ে রইল বিয়ের লাল শাড়ি আর ইব্রাহিমের প্রথম কাঠের ঘোড়াটি।
“মা, বরই খাব” — ক্ষুধার্ত শৈশবের আকুতি
আল-দাব্বাহ শিবিরে বর্তমানে দারফুর ও কোর্দোফান থেকে আসা প্রায় ৮০ হাজার মানুষ অত্যন্ত অমানবিক পরিস্থিতিতে বাস করছেন। জাতিসংঘের সুদান প্রধান ডেনিস ব্রাউন গত জানুয়ারিতে এই শিবির পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেছিলেন—
“এই মানুষগুলোর দেহে এবং চোখে যুদ্ধের ক্ষত সরাসরি দেখা যায়। আমি নিজে একটি ৮ বছরের শিশুকে দেখেছি, যার পা গোলার আঘাতে কেটে ফেলতে হয়েছে।”
তবে বর্তমান শিবিরের সবচেয়ে বড় শত্রুর নাম ‘ক্ষুধা’। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, উত্তর দারফুরের উম বারু অঞ্চলে ৫৩% শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত জরুরি অবস্থার সীমার চেয়ে তিনগুণ বেশি।
আমিনার ছেলে ইব্রাহিমও এই মরণব্যাধির শিকার। গত তিন দিন ধরে আমিনা নিজে কিছুই খাননি, ত্রাণের সামান্য চাল ফুটিয়ে ছেলেকে দিয়েছেন। এরই মধ্যে কাল রাতে ইব্রাহিম তার মাকে জিজ্ঞেস করে বসে—”মা, আমাদের গাছটা কি এখনো আছে? বরই খাব।” চোখের পানি লুকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন মা। সেজদায় গিয়ে শুধু আল্লাহর কাছে কাঁদেন—”সব তো কেড়ে নিলে আল্লাহ, শুধু এই ছেলেটার হাসিটুকু কেড়ে নিও না।”
আন্তর্জাতিক নীরবতা ও নেশন টুডে২৪-এর সম্পাদকীয় মন্তব্য
সুদানের এই সংকট আজ শুধু গৃহযুদ্ধ নয়, এটি একটি পরিকল্পিত মানবিক অবহেলা। ফিউস নেট (FEWS NET) রিপোর্ট অনুযায়ী, কাদুগলি ও দিল্লিং শহর দীর্ঘ অবরোধের কারণে মে মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ দুর্ভিক্ষের গ্রাসে চলে যাবে, যদি না দ্রুত মানবিক সাহায্য পৌঁছায়। গত সপ্তাহেও আল-দাইন শহরে ড্রোন হামলায় ৬ জন সাধারণ মানুষ মারা গেছেন।
বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যম যখন অন্য আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে ব্যস্ত, তখন ৫ কোটি সুদানি নাগরিক এক বুক নীরব হাহাকার নিয়ে দিন গুনছেন। নেশন টুডে২৪-এর পক্ষ থেকে আমরা বিশ্বনেতৃবৃন্দ এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই—সুদানের এই কান্না থামানোর জন্য অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং ত্রাণের পথ উন্মুক্ত করা হোক।
হে আল্লাহ, সুদানের মজলুম মা ও শিশুদের রক্ষা করো। তাদের অবরুদ্ধ আকাশ শান্ত করো এবং আমিনাদের আবার
তাদের শান্ত মাটির ঘরে ফিরিয়ে দাও। আমীন।
মন্তব্য করুন