ব্রেকিং নিউজ
NationToday 24
১০ জুন ২০২৬, ৭:৩৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

অধিকারে মোড়কে পাহাড়ি সন্ত্রাস ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি” –

“অধিকারে মোড়কে পাহাড়ি সন্ত্রাস ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি”

গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে, জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে ইউএনপিএফআইআই-এর ২৫তম অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি অগাস্টিনা চাকমা তার একটি বক্তব্যে উল্লেখ করে – “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারী ও শিশুরা প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে ওঠে এই অনিশ্চয়তা নিয়ে যে তারা পরবর্তী হামলা থেকে বাঁচতে পারবে কিনা। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে দেওয়া আত্মনিয়ন্ত্রণ, ভূমির মালিকানা এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিগুলো ভেঙে পড়েছে, যার ফলে তারা প্রতিনিয়ত সহিংসতা ও বঞ্চনার মুখোমুখি হচ্ছে।”

 

.

রাষ্ট্র বা নিরাপত্তা বাহিনীর কারণে পাহাড়ের নারীরা অনিরাপদ – এমন জঘন্য মিথ্যাচার স্পষ্ট দেশদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে! সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যকার সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং অপহরণের ঘটনাগুলোকে সুকৌশলে আড়াল করে সাধারণ পাহাড়ি ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর দোষ চাপানোর এক ভয়ংকর ছক বা নীলনকশা আঁকা হয়েছে।

 

বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে এ অপপ্রচার এবং আন্তর্জাতিক লবিং বহুগুণ বেড়েছে।

.

দেশ স্বাধীনের পর, মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে যে চার দফা দাবী উত্থাপন করেছিল, তার একটিও পূরন না করে শেখ মুজিব পাহাড়িদের বাঙালী হয়ে যাবার কথা বলায় পাহাড়িরা মারমুখী হয়ে উঠে। সে চার দফার মূল কথা ছিলো পাহাড়িদের স্বায়াত্ত্বশাসন, বাঙালীদের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধকরণ।

 

মানবেন্দ্র লারমা অবস্থা অনুকুলে না দেখে সশস্ত্র বাহিনী গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেটি গঠনও করে। যা পরবর্তিতে পিসিজেএসএস নামে পরিচিত হয়।

 

পিসিজেএসএসের যাত্রা শুরু ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি সে ‘শান্তি বাহিনী’ নামে সশস্ত্র শাখা গঠন করে। পরবর্তী সময়ে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক সহিংসতার অভিযোগ ওঠে। ১৯৮৪ সালের ভূষণছড়া ঘটনায় কমপক্ষে ৪০০ বাঙালি বেসামরিক হত্যা, ১৯৮১ সালে একটি বিডিআর ক্যাম্পে হামলায় ১৩ জন নিরাপত্তা সদস্য ও ২৪ জন বেসামরিক নিহত এবং ১৯৯৬ সালে ৩০ জন বাঙালি কাঠুরিয়াকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। [১]

.

এখানে শুধু কয়েকটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। তাদের অপরাধের হিসেব আরও বিস্তৃত। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর খাগড়াছড়ির খেদারাছড়ায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিহত হয়। মানবেন্দ্র মৃত্যুর পর এর দায়িত্ব নেয় সন্তু লারমা।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে এহেন অপরাধ নেই যা হয়নি। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে সন্তু লারমার শান্তি বাহিনী। এতকিছু সত্ত্বে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সবচেয়ে বিতর্কিত পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সন্তু লারমার সাথে করে।

 

এই চুক্তি দেশ বিরোধী, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিরোধী, মৌলিক অধিকার – সমতা-সমসুযোগ বিরোধী বলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলিমরা এর বিরোধীতা তখন থেকেই করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আরো ১২টি উপজাতিকে বাদ দিয়ে চাকমা শান্তি বাহিনীর সাথেই সরকার চুক্তি করেছে। কেবল চাকমাদের সাথে চুক্তি অন্যদের অধিকার ও সুযোগ হরণ মাত্র।

.

শান্তি চুক্তির পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সামাজিক অপরাধের বাইরে তিন পার্বত্য জেলায় মোট খুন হয়েছে ২ হাজার ৫৭৩ জন মানুষ। অপহৃত হয়েছে অন্তত ২ হাজার ৬২৬ জন।[২]

 

গত বছরও (২০২৫ সালে) পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড়ি সংগঠন ইউপিডিএফ (প্রসীত), জেএসএস (সন্তু), কেএনএফ ও এমএলপির সহিংসতায় অন্তত ৫২ জন নিহত ও ১২৪ জন অপহৃত হন। [১.১]

 

নিহতদের মধ্যে পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয় সম্প্রদায়ে থাকলেও বাঙালিদের সংখ্যা বেশি। বাঙালিরা খুন হয়েছেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও চাঁদাবাজির জের ধরে এবং অধিকাংশই পাহাড়িদের হাতে।

.

পাহাড়ে কর্মরত বিভিন্ন সূত্রের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের কাছে তিন হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র আছে। সেখানে পুরনো অস্ত্রের পাশাপাশি নতুন এবং অত্যাধুনিক কিছু অস্ত্রও রয়েছে। এসবের মধ্যে আছে এম ১৬ রাইফেল, মায়ানমারে তৈরি এম ১ রাইফেল, একে ৪৭ রাইফেল, একে ২২ রাইফেল এবং এলএমজি (লাইট মেশিনগান)।[২.১]

 

স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর অভিযোগ—পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর অস্ত্র ও সদস্যদের তালিকা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও জেএসএস, ইউপিডিএফসহ কোনো সংগঠনই তা করেনি।

অস্ত্র চোরাচালানে ব্যবহৃত প্রধান রুটগুলোর একটি মিয়ানমার থেকে ভারতের মিজোরাম হয়ে রাঙামাটির থাচি, লুলংছড়ি, চাকপতিঘাট ও বসন্তপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত।[৩]

ভারতের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে এসব রুটে পাঁচটি বড় অস্ত্র চালান আটক করা হয়েছে। এসব চালানে একে-৪৭, এম-১৬ রাইফেল, গ্রেনেড ও গ্রেনেড লঞ্চারসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ছিল।[৩.১]

 

এসব অস্ত্রের টাকা আসে চাঁদাবাজি থেকে।

২০২৫ সালে ১৮৩টি চাঁদাবাজির ঘটনায় আনুমানিক এক হাজার কোটি থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়।[১.২]

 

এদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৭০০ জেএসএস সন্ত্রাসী দেশে প্রবেশ করেছে। [৪]

.

পার্বত্য এলাকায় কাজ করা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, মূলত জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফের সামরিক শাখার নিয়ন্ত্রণ যারা করে, তারা কেউ বর্তমানে বাংলাদেশে নেই। জেএসএসের অস্ত্রধারী ক্যাডারদের মধ্যে সুভাস চাকমা ওরফে জার্নাল বাবু, সুবল চাকমা ওরফে আশিষ বাবু, জ্ঞান চাকমা ওরফে কার্জন চাকমা, প্রণতি বিকাশ চাকমা, পরিণতি চাকমা ও অভিযান চাকমা অন্যতম। এছাড়া ইউপিডিএফ ক্যাডারদের মধ্যে সজিব চাকমা, উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা, রঞ্জন মণি চাকমা, রজন বসু ও শ্রাবণ চাকমা অন্যতম। এদের সবাই ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরায় অবস্থান করে এদেশে থাকা সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে অপারেশন পরিচালনা করছে।[৫]

 

দেশের এই অরাজকতা জিইইয়ে রাখার জন্য অস্ত্র আসছে ভারত থেকে, সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে ভারতে। ভারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক করতে ব্রিটিশ আমলের শেষ থেকে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। ১৯৭১ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে, সরকার সে ষড়যন্ত্রের ‘পাতানো ফাঁদে’ এদেশের এক সম্পদশালী এক-দশমাংশ এলাকাকে ঠেলে দিয়েছে।

.

মুসলিম অধ্যুষিত এই বাংলাদেশকে বরাবরই ভারত তার লক্ষ্য (অখন্ড ভারত) অর্জনের পথে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে। তাই তো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাহাড়ি সন্ত্রাস টিকিয়ে রেখেছে, অস্ত্রের যোগান দিয়ে যাচ্ছে।

 

এসব ষড়যন্ত্রের একটি অংশ এই অগাস্টিনাদের মিথ্যাচার, যাতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের পটভূমি তৈরি করা যায়।

 

সন্তু লারমা ২৮ বছর ধরে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে পার্বত্য অঞ্চলের অগ্রগতিতে কী ভূমিকা রেখেছে? তারা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিটি অভিযানকে অত্যাচার হিসেবে অপপ্রচার চালায়।

অগাস্টিনারা আসলে পাহাড়ে শান্তি চায় না। রক্তপাত, রক্তচক্ষু ধরে রাখতে চায়। এই ভূমিতে থেকেও তারা ভারতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

 

* লেখাটির পিডিএফ ডাউনলোড করুন কমেন্ট থেকে

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মুসলিম পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার দাবিতে ক্ষোভ

বাংলা কিউআর’: বদলে যাবে ডিজিটাল লেনদেন, কী লাভ-ক্ষতি?

আলীকদমে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে টিন আত্মসাৎ ও রোহিঙ্গাকে ভোটার বানানোর অভিযোগ, তদন্তের দাবি

ইলিয়াসকে ঘিরে নতুন বিতর্ক, যুবদল থেকে বহিষ্কার ও একাধিক মামলার তথ্য সামনে

বান্দরবানের পাহাড়ে নতুন আতঙ্ক: খুমি পিপল ফোর্স (KPF) তৎপরতার আশঙ্কা

অর্ধেকদ্বীন ডটকম: শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক ম্যাট্রিমনি প্ল্যাটফর্মে শত শত বিবাহ সম্পন্নের দাবি

রাখাইনে হামলার জেরে এএ নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা, প্রধানের মৃত্যুর দাবি

মিছিলের চেষ্টাকালে রাজধানীতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ১৪ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

রাতের মধ্যে সরিয়ে ফেলা হলো সব কালিমা খচিত পতাকা, রহস্য ঘনীভূত

যেসব খেলাধুলাতে ইসলাম উৎসাহ দেয়

১০

উখিয়ায় ৫৯৫ পিস ইয়াবাসহ একই পরিবারের চার ভাই-বোন আটক

১১

টেকনাফে ১০টি হ্যান্ড গ্রেনেড, গুলি ও মাদক উদ্ধার: কোস্ট গার্ডের অভিযান

১২

আলীকদমে বিদ্যুৎ বিপর্যয়: জবাবদিহিতা ও সমাধান চাইছে জনতা

১৩

কক্সবাজারে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও নগদ টাকাসহ ৪ পাচারকারী গ্রেফতার: নেপথ্যে আরকান আর্মি ও আরএসও

১৪

অবিবাহিতদের ক্যানসার ঝুঁকি বেশি? নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

১৫

উখিয়ায় ৬৪ বিজিবির বিশাল অভিযান: ৫০ হাজার ইয়াবা, বিদেশি পিস্তল ও দেশীয় অস্ত্রসহ বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার

১৬

ধর্ম পরিবর্তনের জেরে অপহরণ? ঋষি আশ্রম থেকে নওমুসলিম তরুণী উদ্ধার!

১৭

ইচ্ছার বিরুদ্ধে আরাকান আর্মিতে নিয়োগ: বান্দরবান সীমান্তে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি

১৮

মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ

১৯

পুলিশের হানায় ভন্ডুল আওয়ামী লীগের ‘খিচুড়ি পার্টি’, নড়িয়ায় আটক ২

২০