আলীকদমে অর্থের প্রলোভনে দেড় শতাধিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীকে ধর্মান্তরের অভিযোগ, এলাকায় ক্ষোভ
আলীকদম প্রতিনিধি | নেশন টুডে**এই চঞ্চল্যকর নিউজটি প্রকাশিত হয় ৫ অক্টোবর ২০০৩ সালের কর্ণফুলী পত্রিকায় সময় পত্রিকাটির প্রতিবেদক ছিলেন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ,
আলীকদম (বান্দরবান): বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলায় ‘সেভেন এডভেন্টিস’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) বিরুদ্ধে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে দেড় শতাধিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীকে খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ উঠেছে। তঞ্চঙ্গা ও মার্মা সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষকে ধর্মান্তরের এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সচেতন মহল ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর আলীকদম উপজেলার তালুক চন্দ্র পাড়ায় ‘সেভেন এডভেন্টিস’ এনজিওর উদ্যোগে স্থানীয় তঞ্চঙ্গা উপজাতীয়দের নিয়ে একটি প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়। সংস্থাটির লামা-আলীকদম জোনের কর্মকর্তা অরুণ এবং স্থানীয় কয়েকজন এজেন্টের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই খ্রীষ্টানীকরণ মিশন সফল করতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে ‘এজেন্ট’ হিসেবে নিয়োগ দেয় এনজিওটি। এই এজেন্টরা দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়ী এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক সচ্ছলতা ও নানা সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিভোজ শেষে ভিডিও ক্যামেরার সামনে প্রায় ১১০ জন তঞ্চঙ্গা নারী-পুরুষকে খ্রীষ্টান ধর্মীয় পবিত্র গ্রন্থ বাইবেল ধরিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়।
এর পরদিন, ২৪ সেপ্টেম্বর উপজেলার রেপার পাড়াস্থ শিশু পাড়ায় একই কৌশলে আরেকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানেও প্রায় অর্ধ শতাধিক মার্মা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষকে একইভাবে খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করা হয় বলে জানা গেছে।
পার্বত্য অঞ্চলের এই সংবেদনশীল পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ:
বৌদ্ধ ভিক্ষু উ ইউচারা (পরিচালক, মাতামুহুরী উপজাতীয় শিশু কল্যাণ অনাথালয়): তিনি গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আর্থিক অসচ্ছলতার সুযোগ নিয়ে মিশনারীরা এই ধর্মান্তরকরণ প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। অর্থের প্রলোভনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতীয় জাতিসত্তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।”
বাবু দুংড়িং মং মার্মা (সভাপতি, আলীকদম উপজেলা আওয়ামী যুবলীগ) ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি, পার্বত্য অঞ্চলের বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জরুরি ও সম্মিলিত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
দিলীপ তঞ্চঙ্গা (সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ত্রিরত্ন বৌদ্ধ বিহার): ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, “পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ ধর্মের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপপ্রয়াস চলছে।” মিশনারীদের এই কার্যক্রম বন্ধে তিনি পার্বত্য মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আলীকদম উপজেলা প্রশাসনের মাত্র দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যে বিগত কয়েক বছরে অন্তত ৪ থেকে ৫টি খ্রীষ্টান মিশনারী এনজিও গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ‘সেভেন এডভেন্টিস’ এবং ‘এজি চার্চ’ নামের সংস্থা দুটি উপজেলা সদরে দৃশ্যত কোনো অফিস চালু না করলেও, অত্যন্ত গোপনে দুর্গম পাহাড়ী পল্লীগুলোতে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আলীকদম উপজেলার ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। এমনকি মুরং সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় রীতিনীতি ছেড়ে খ্রীষ্টান ধর্মের উৎসব পালন করছেন এবং কেউ কেউ ‘ক্রামা’ নামের নতুন একটি মতবাদের অনুসারী হয়ে পড়েছেন।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, তিন পার্বত্য জেলার বৈচিত্র্যময় সমাজ, সংস্কৃতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পেছনে প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মিশনারী সংস্থাগুলোর এই আগ্রাসী তৎপরতা স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল জেএসএস-এর শীর্ষ নেতা সন্তু লারমা বিভিন্ন সময় পাহাড়ে ‘ইসলামীকরণে’র অভিযোগ তুলে সরব হলেও, খ্রীষ্টানীকরণের এই প্রকাশ্য তৎপরতা নিয়ে রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছেন।
ধর্মান্তরকরণের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলীকদম ও আশেপাশের পার্বত্য এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি
বিরাজ করছে।
মন্তব্য করুন