বিশেষ প্রতিনিধি, নেশন টুডে২৪
দীর্ঘ দুই মাসের রহস্য ও টানটান উত্তেজনার পর অবশেষে অবসান ঘটল এক তরুণীর নিখোঁজ রহস্যের। রাঙামাটির চন্দ্রঘোনা থানাধীন বাঙ্গালহালিয়া এলাকার ‘সনাতন ঋষি আশ্রম’ থেকে আয়েশা সিদ্দিকা জারা (২১) নামের এক নওমুসলিম তরুণীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে আদালতের সার্চ ওয়ারেন্ট মূলে এক যৌথ অভিযানের পর তাকে উদ্ধার করা হয়।
এই উদ্ধারের পর ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারিবারিক চাপ এবং তরুণীর আইনি অধিকার নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
যেভাবে চলল উদ্ধার অভিযান
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার আদালত থেকে জারি করা একটি সার্চ ওয়ারেন্ট এবং ঈদগাঁও থানা পুলিশের রিকুইজিশনের ভিত্তিতে চন্দ্রঘোনা থানা পুলিশ বাঙ্গালহালিয়ার ওই আশ্রমে অভিযান চালায়।
চন্দ্রঘোনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ সাকের আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন:
”আদালতের নির্দেশনা ও ঈদগাঁও থানা পুলিশের অনুরোধে আমরা বাঙ্গালহালিয়া সনাতন ঋষি আশ্রমে অভিযান চালিয়ে তরুণীকে উদ্ধার করি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে ঈদগাঁও থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ তারাই নেবেন।”
সনাতন ধর্ম থেকে ইসলাম: জারার রূপান্তর ও নিখোঁজ হওয়া
অনুসন্ধানে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া তরুণীর পূর্ব নাম ছিল তন্নী দে ঋপন্না। তিনি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সদর হিন্দুপাড়ার সঞ্জিত কুমার দে-র মেয়ে। প্রায় এক বছর আগে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং চলতি বছরের ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হলফনামার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘আয়েশা সিদ্দিকা জারা’ নাম নেন।
জারার সহপাঠীদের অভিযোগ, ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই তার ওপর পারিবারিক নির্যাতন নেমে আসে। গত ৯ মার্চ চকবাজার থানা পুলিশের সহায়তায় তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হিন্দু পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগের দিন জারা তার সহপাঠীদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে একটি আকুতিভরা বার্তা পাঠান:
‘আমাকে উদ্ধার করুন, আমাকে তারা মেরে ফেলবে, ভারতে পাচার করতে পারে।’
এরপর ২৮ মার্চ কক্সবাজারের ঈদগাঁওয়ের জাগিরপাড়া এলাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পথে তিনি নিখোঁজ হন। সহপাঠীদের দাবি, তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়েছিল।
আইনি লড়াই ও আদালতের হস্তক্ষেপ
জারা নিখোঁজ হওয়ার পর তার কলেজের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. শহীদুল ইসলাম বাদী হয়ে জারার বাবা-মাকে আসামি করে প্রথমে ঈদগাঁও থানায় অভিযোগ করেন। পরে সেখানে কাজ না হওয়ায় কক্সবাজারের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০০ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার প্রেক্ষিতেই আদালত এই তল্লাশি পরোয়ানা জারি করে।
দুই পক্ষের বক্তব্য: আশ্রম বনাম পরিবার
উদ্ধার হওয়া আয়েশা (জারা): উদ্ধারের পর জারা স্পষ্ট জানান, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং গত ১ মার্চ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা হয়েছিল।
জারার মা (তপশী দে): অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার করে তার মা দাবি করেন, জারাকে কোনো জোরজবরি করা হয়নি। তাকে কেবল ‘ধর্মীয় দীক্ষা’ দেওয়ার উদ্দেশ্যে কয়েকদিন আগে এই আশ্রমে নিয়ে আসা হয়েছিল।
আশ্রম কর্তৃপক্ষ: বাঙ্গালহালিয়া সনাতন ঋষি আশ্রমের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ঋষি জানান, “মেয়েটি প্রায় দুই মাস ধরে আমাদের আশ্রমে ছিল। তার বাবা-মাই তাকে এখানে রেখে যান। সে যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে, এই বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।”
বর্তমান পরিস্থিতি
প্রাপ্তবয়স্ক একজন নাগরিকের নিজের ধর্ম বেছে নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে দুই মাস ধরে আশ্রমে ‘দীক্ষা’র নামে রাখা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকার কর্মীরা। বর্তমানে আয়েশা সিদ্দিকা জারাকে ঈদগাঁও থানা পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তার পরবর্তী ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানা গেছে।
মন্তব্য করুন